তপ্তকাঞ্চনের ‘ইসলামী শরিয়ত বনাম বাংলাদেশ আইন’ (পর্ব ১) পোষ্টের মন্তব্য.. “ইসলামে তালাক কথা”
নভেম্বর 4, 2009 at 12:21 অপরাহ্ন মন্তব্য দিন
তপ্তকাঞ্চন ভাইয়ের পোষ্টে মন্তব্যটা ছোট আকারেই করবো ভেবেছিলাম। লেখা শেষ হতে দেখি বড় হয়ে গেছে। তাই ভাবলাম ভিন্ন পোষ্টে বিষয়টা তুলে ধরি, এতে হয়তো অনেকেই তা পড়ার সুযোগ পাবেন।
।১।
স্বামীর অত্যাচারে বা অন্য কোন কারণে স্ত্রীর অপছন্দ থাকলে স্বামীর সাথে খুলা’ (خلع) করার বিধান ইসলামে আছে। খুলা’ করার নিয়মটা হলো এই যে, স্ত্রী স্বামীকে মোহরানার টাকাটা ফেরৎ দেওয়ার শর্তে কিংবা অন্য কোন অংক দেওয়ার শর্তে স্বামীকর্তৃক বিবাহ বন্ধন ছেদ করিয়ে নিবে। স্বামী-স্ত্রীর সম্মতিক্রমে কৃত এই ব্যাপারটি এক তালাকে বায়েন হিসেবে গণ্য হবে। পরবর্তীতে উভয়ে পুণরায় একে অপরকে গ্রহণ করতে চাইলে নতুন করে বিবাহ করতে হবে।
খুলা’ অর্থ খোলা। এর দ্বারা রূপক অর্থে বিবাহের পরিচ্ছদ খুলে ফেলা হয় তাই খুলা’ বলা হয়। আবার তালাকের অর্থও এর কাছাকাছি। সম্ভবত এ থেকেই এ দেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুসলিম পারিবারিক আইনে খুলা’ -র ভিন্ন অধ্যায় থাকায় এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে হচ্ছে। কাজেই খুলা’ ছাড়া স্ত্রীকে ভিন্ন ভাবে তালাকের ক্ষমতা দেওয়াকে ‘ইসলাম সম্মত নয়’ বলতেই হচ্ছে।
।২।
এখানে বলে নেওয়া ভালো যে, ইসলাম যেমন ভাবে স্ত্রীকে কেবল স্বামীর অত্যাচারের সময় কিংবা একান্ত বনিবনা না হওয়ার ক্ষেত্রে খুলা’ করার অনুমতি দিয়েছে, তেমনি স্বামীকেও স্ত্রীর চূড়ান্ত অবাধ্যতা ও সবরকম চেষ্টার পরও বনিবনা না হওয়ার ক্ষেত্রে তালাক দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। সাথে সাথে বারবার এ ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে, “আল্লাহর নিকট সর্ব নিকৃষ্ট বৈধ বিধান হলো তালাক।” (হাদীস) কাজেই যত্রতত্র তা ব্যবহার করা থেকে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
।৩।
একটা প্রসঙ্গ প্রায়ই আলোচিত হয় যে, রাগের মাথায় স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে আর ফতোয়াবাজ মৌলভীরা স্ত্রীকে হিল্লা বিবাহে বাধ্য করছে। অমানবিক। মানবতাবিরোধী.. সত্যিই তো..
কিন্তু কথা হচ্ছে, আপনি যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে, ইসলাম কেন এমন কঠিন নির্দেশ দিয়েছে, তা হলেই এর যথার্থতা যথার্থ ভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।
ইসলাম বারবার স্বামীকে সতর্ক করেছে যেন সে তার প্রেয়সী স্ত্রীর সাথে নূন্যতম খারাপ আচরণ না করে। ঘোষণা দিয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।” (হাদীস) উপদেশ দিয়েছে, “দেখো, যদি তুমি তার (স্ত্রীর) একটি আচরণে অসন্তুষ্ট হও, তা হলে তার অন্য কোন আচরণ নিশ্চয় তোমাকে মুগ্ধ করবে। ফলে সে দিকে লক্ষ্য করে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখো।” (হাদীসের মর্মার্থ) এভাবে বারবার বিভিন্ন ভাবে স্বামীকে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছে, একান্তই যদি তোমার সাথে মিল না হয় তবে তাকে বোঝাও।
এতেও না হলে একই খাটে আলাদা আলাদা শয়ন করো। এরপর ভিন্ন খাটে শোও। অতপর ভিন্ন ঘরে… এভাবেও ঠিক না হলে উভয় পরিবারের লোক দিয়ে মিটমাট করার চেষ্টা করো।
এরপর একেবারেই নিরুপায় হলে কেবল এক তালাক দাও। এরপর অপেক্ষা করো এক মাস। এর মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেলে বিনা বিবাহেই তাকে গ্রহণ করতে পার।
নতুবা এক মাস পর আরেক তালাক দাও। এবারো সব ঠিক হয়ে গেলে বিনা বিবাহে তাকে গ্রহণ করে নিতে পার। (তালাকে রাজঈর ক্ষেত্রে। বায়েন তালাকের ক্ষেত্রে নতুন বিবাহ লাগবে।)
এরপরও যদি বনিবনা না হয়, তা হলে এক মাস পর শেষ তালাক দিতে পার। তবে এটার পর স্ত্রীকে গ্রহণ করা আর সহজ হবে না। তখন হিল্লা বিবাহ লাগবে।
দেখুন, এতগুলো স্তর পেরিয়ে আসলে কেউ কি সত্যিই তিন তালাক দিবে? স্তরগুলো আমার বানানো নয়। কুরআন এবং হাদীসের সার নির্যাস এগুলো।
নারীর মর্যাদা ধরে রাখার জন্যই ইসলামের এ বিধান। নারী যেন খেলনার বস্তুতে পরিণত না হয়, যেন যখন তখন তাকে স্বামী ছেড়ে দিতে না পারে, আবার যখন তখন তাকে গ্রহণ করতে না পারে, এ জন্যই এ বিধান।
কোন স্বামী যদি কল্পনা করে যে, আমি তিন তালাক দিলে আমার স্ত্রীকে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বসতে হবে। তারপর তার সাথে তাকে শুতে হবে। এরপর সে তালাক দিলে আমি তাকে পুণরায় গ্রহণ করতে পারব। এত কিছু নয়, শুধু এটুকু ভাবলেই যথেষ্ট যে, ‘আমার প্রেয়সীকে পর পুরুষের সাথে রাত কাটাতে হবে’, এটুকু ভাবলেই কোন পুরুষত্বের অধিকারী পুরুষ আর তিন তালাক দিতে পারে না।
বর্তমানে মুসলিম পারিবারিক আইনে মৌখিক তালাককে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা দিয়ে মূলত নারীকে খেলনার পাত্র বানানো হয়েছে, যা ইসলামের মেজাজের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এতে হয়েছে কী, স্বামী যখন ইচ্ছে স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছে, আবার সে রাতেই তার সাথে মিলিত হচ্ছে… কত ঘৃণার ব্যাপার… ছি..
অতএব, এখন যে সচেতনতা চলছে যে, “মৌখিক তালাক দিলে তা কার্যকরী হবে না। মেম্বার চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট ইত্যাদি লাগবে”, তার চেয়ে বরং “তিন তালাক দিলে স্ত্রীকে পর পুরুষের সাথে শুতে হবে” এ সচেতনতা বাড়ানো দরকার। বর্তমান সচেতনতায় তিন তালাকের সংখ্যা বাড়ছে এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পাপ ও পাপীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী পরিণত হচ্ছে স্বামীর হাতের খেলনা।
আর তিন তালাকের ভয়াবহতার সচেতনতা বাড়ালে তিন তালাকের সংখ্যাও কমবে, নারীর মর্যাদাও বাড়বে। বিষয়টি উপলব্ধি করা দরকার গভীর ভাবে।
।৩।
একটি কথা প্রায়ই শুনি, রাগের মাথায় স্বামী তালাক দিয়ে ফেলেছে.. আরে ভাই, তালাক তো রাগের মাথায়ই দেয়, সোহাগের সুরে কি কখনো তালাক থাকে?
——————————————————
৫-১০ মিনিটের উপস্থিত টাইপিংয়ের ফসল এটি। তাই কোন রেফারেন্স যুক্ত করতে পারিনি। তবে ভবিষ্যতে এ নিয়ে তথ্যনির্ভর একটি পোষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে আছে। সবার কাছে দু’আ চাচ্ছি। ধন্যবাদ।
Entry filed under: যুক্তি. Tags: .
Trackback this post | Subscribe to the comments via RSS Feed