এন্টি নাস্তিকতা (২): বিবর্তনবাদ : কতটা বিবর্তিত ?
নভেম্বর 4, 2009 at 12:29 অপরাহ্ন মন্তব্য দিন
বর্তমান সময়ে নাস্তিকতার প্রধান ( কিংবা শক্তিশালী) বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হয়তো বিবর্তনবাদ। কেননা প্রধান-প্রমান-ধর্মগুলোর প্রত্যেকটিতে বলা হয়েছে মানবজাতি সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, আর বিবর্তনবাদ সরাসরি এর বিরোধী। একটা সময় ছিল যখন এর ভিত্তি ছিল বস্তুবাদ , অর্থাৎ বিশ্বজগতের শুরু নেই শেষ নেই,যে যার মত নিয়ম বানিয়ে জীবনটা পার করলেই হল,ধর্ম মানার কোন দরকার কী।কিন্তু বস্তুবাদের দুর্বলতা ছিল জীবজগৎ-মানুষ কীভাবে সৃষ্টি হল সে সর্ম্পকে কোন ধারনা দেয় না, তাই যখন এর ব্যাখ্যা নিয়ে বিবর্তনবাদ এল,সাথে সাথে ধর্মবিরোধী সমাজের ভিত্তি হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।
বিবর্তনবাদ মিডিয়ার কল্যানে এতটা জনপ্রিয় যে বিজ্ঞানের কিছুই জানেন না তারাও বলতে পারে -‘ডারউইন বলেছিল, মানুষ তো বাঁদর ছিল’ । মিডিয়ার জন্য এটা সবসময় হট টপিক। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হল ডারউইনের সময়ের পর অনেক দিন কেটে গেছে, এরমধ্যে ডারউইনের তত্ত্বের অসারতা প্রমান হওয়ায় বিজ্ঞানীরা নিওডারউইনিসম তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে -সে তত্ত্বও এখন অস্তিত্বহীনতার সম্মুখীন,প্রাকৃতিক নির্বাচনের বদলে মিউটেশন তত্ত্ব এসেছে,ডিএনএ এর মডেল আবিষ্কার হওয়ার পর পুরো ধারনা হুমকির মুখে পড়েছে,বিবর্তন মতবাদ নিয়ে অনেকের অনেক জালিয়াতি ধরা পড়েছে কিন্তু এখনো অধিকাংশ মানুষ ডারউইনের অরিজিন অব স্পিসিস এর ধ্যান ধারণা নিয়ে বসে আছে
বিবর্তনবাদ আমাদের দেশ সহ অনেক দেশে স্কুলে এবং মিডিয়ায় এমন ভাবে উপস্থাপিত হয় যেন এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য(ফ্যাক্ট)।অথচ পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এমন কোন প্রকৃত সায়েন্সের বই নেই যেখানে বিবর্তনবাদকে ফ্যাক্ট বলা হয়, সব সময়ই থিওরী বা অ্যাসাম্পশন।আর যে কোন থিওরী যে কোন দিন মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে।
বিবর্তনবাদ বর্তমানে নাস্তিকতার ভিত্তি তা কেউ না মানলেও এটা না মেনে উপায় নেই এটি এর এর শক্তিশালী সাহায্যকারী ধারনা। ডারউইন যখন তার এ তত্ত্ব প্রচার করলেন তখন সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল স্বভাবতই সমস্ত ধর্মবিরোধী মতবাদের অনুসারীরা। মার্কসবাদ,ফ্যাসিজম,ফ্রয়েডীতত্ত্ব অনুসারীরা যেন হাতে চাঁদ পেল। একটা উদাহরনে তা ভালো বোঝা যায়-
কার্ল মার্কস তার উপর এতই কৃতজ্ঞচিত্ত ছিল যে তার সর্বোত্তম কাজ বলে বিবেচিত-দাস কাপিটাল-উৎসর্গ করেছেন ডারউইনকে।
বিবর্তনবাদ বর্তমান সময়ে যতটা না বিজ্ঞানের তারচেয়ে বেশি মিডিয়ার সম্পত্তি। এটি অত্যন্ত চটকদার,মজারু আর এর প্রভাব অপরিসীম, এটি বিভিন্ন দেশে যত দ্রুত অনুদিত হয়ে পৌছেছে তার নজির খুব কম আছে। চীনে এর প্রভাব ছিল অসীম,ইউরোপের কথা ছেড়েই দিলাম। পরবর্তীতে এর যে বিরূপ প্রভাব দেশে দেশে পড়েছিল আমার ধারনা ডারউইনের মত জ্ঞানপিপাসু লোক যদি আগে তা আন্দ্াজ করতে পারত তাহলে কখনোই এরকম কোন বই লিখে যেতেন না। যুগে যুগে কোন যথার্থ প্রমান না থাকা সত্ত্বেও কিছু বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদকে সমর্থন দিয়ে এসেছে কারন তারা জীব জগৎ সৃষ্টিতে- হয় অলৌকিক ভাবে প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বাস করতে হয় নইলে বিবর্তনবাদে আস্থা রাখতে হয়, তাদের ধারনা হয়তো কোন এক সময় এর পে প্রমান পাওয়া যাবে।এমনকি কেউ কেউ মরিয়া হয়ে মিথ্যা প্রচারণা ও কাল্পনিক চিত্র ও ধারনা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও করেছে( যথা- পিল্টডাউন ম্যান-যেটি বিবর্তনবাদের প্রত্যক্ষ প্রমান হিসেবে ১৯১২ সাল থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়মে প্রায় ৪০ বৎসর প্রদর্শিত হবার পর প্রমানিত হয় এটি একটি বিরাট জালিয়াতি,নেবারাস্কা ম্যান-প্রায় ৫ বৎসর মানুষ বিবর্তনবাদের প্রমাণ হিসেবে মাতামাতি করার পর ধরা পড়ে সেটা ধোঁকাবাজী,এ ধরনের জালিয়াতি নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনার ইচ্ছা রইল)
মাইকেল ওয়াকার যিনি ইউনিভার্সিটি অব সিডনী এর নৃতত্ত্ববিদ ছিলেন ব্যাখ্যা করেছেন কেন বিবর্তনবাদ এখনো প্রচার করা হচ্ছে, তিনি ১৯৮১ সালে তার এক লেখায় বলেছেন-অনেক বিজ্ঞানী এবং টেকনোলজিষ্ট ডারউইনের থিওরী প্রমানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন তার একমাত্র কারন এটি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে দূর করার চমৎকার মাধ্যম। (তথ্যসূত্র ১)
তাই সত্যিকার অর্থে বলা চলে ডারউইনিসম বা বিবর্তনবাদের ধারণা ধ্বংশ হয়ে গেলে ধর্মবিরোধী মতবাদ গুলো এতটা বিপত্তিতে পড়বে যে ধারণাও করা যায় না।এখন থেকে পরবর্তী কয়েকটা পোষ্টে আমি তাই এ বিবর্তনবাদ নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের মত নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
মিডিয়ার প্রভাবে সাধারণ লোকজন ও আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্টতাহীন মানুষ জানে না যে শত শত বিখ্যাত বিজ্ঞানী,গবেষক রয়েছেন যারা বিবর্তনবাদকে ইতোমধ্যে অচল ও অর্থহীন বলে ছুড়ে ফেলেছেন বহু আগে । আজকে তাহলে দেখা যাক বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও গবেষক যারা বিবর্তনবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তাদের
মন্তব্য-
১. প্রথমে দেখি বিবর্তনবাদ নিয়ে স্বয়ং ডারউইন কী বলেছেন। যারা ডারউইনের অরিজিন অব স্পিসিস বইটা পড়েছেন তারা জানেন এ বইয়ের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের নাম ’ ডিফিকালটিস অন থিওরী’। অর্থাৎ বিবর্তনবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কী কী ব্যাখ্যাতীত সমস্যা রয়েছে তা আলোচনা করেছেন। ডারউইনের আশা ছিল ভবিষ্যতে হয়তো এসব ব্যাপারের ব্যাখ্যা মিলবে, কিন্তু যতই দিন গেল এসব সমস্যা আসলে ততই প্রকট হল,সেসব সমস্যার সমাধান আজ পর্যন্ত হয় নি। ডারউইন পরবর্তীতে নিজেই উপলব্ধি করলেন তার থিওরীতে এত বিভ্রান্তি রয়েছে যে সেসব থেকে বের হয়া যাবে না, তিনি তার বন্ধুদের কাছে বিভিন্ন চিঠিতে লেখেন তিনি দিন দিন তার থিওরীর উপর আস্থা হারাচ্ছেন। ডারউইনের ছেলে ফ্রান্সিস ডারউইন ডারউইনের চিঠিপত্র সংকলন করে বই প্রকাশ করেন -লাইফ অ্যান্ড লেটারস অব চার্লস ডারউইন- সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ নিকট বন্ধু ও বিজ্ঞানীদের কাছে লেখা চিঠিতে ডারউইন তার থিওরী নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন । তিনি হার্ভাড ইউনিভার্সিটির বায়োলজির প্রফেসর অ্যসা গ্রে কে এক চিঠিতে লেখেন-আমি চিন্তিত যে আমার কাজ গুলো সত্যিকারের বিজ্ঞান থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। (তথ্যসূত্র ২,৩)
২. ফ্রেঞ্চ একাডেমী অব সায়েন্স এর একসময়কার প্রেসিডেন্ট পি পি গ্রাসে বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখা-ইভলিউশন অব লিভিং অরগানিজমস-বইয়ের লেখক, তিনি বলেছেন- আজ আমাদের কর্তব্য বিবর্তনবাদের রূপকথাকে ধ্বংস করে ফেলা..বিবর্তনবাদের এ প্রতারণা কখনো অজান্তেই হচ্ছে আবার কিছু দল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এর অবাস্তবতা অস্বীকার করছে।(তথ্যসূত্র ৪)
৩. এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে ছাত্রাবস্থায় আমি যত বিবর্তনবাদের ব্যাপারে জেনেছি..এখন তার সবই তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছি।-বলেছেন প্রফেসর ডেরেক অ্যাজের , সাবেক প্রেসিডেন্ট অব ব্রিটিশ অ্যাসেসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্চমেন্ট অব সায়েন্স এবং সোয়নসী ইউনির্ভাসিটির জিওলজি ও ওশানোগ্রাফি বিভাগের প্রধান। (তথ্যসূত্র ৫)
৪. পল লেমোনি, প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিষ্ট্রি এর সাবেক ডিরেক্টর বলেছেন-
ইভোলিউশন থিওরী আজ পুরো পৃথিবীতে ছাত্রদের শেখানো হচ্ছে অথচ জুলজি, বোটানি প্রভৃতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ গণ এ বিষয়ে একমত যে বিবর্তনবাদের কারও কাছে কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।…এর ফলাফল বলে যে ইভোলিউশন থিওরী সম্পূর্ন অসম্ভব।(তথ্যসূত্র ৬)
৫. কোষ জেনেটিকসের অধ্যাপক ফ্রান্সিস জ্যাকব,১৯৬৫ সালে যিনি মেডিসিনের গবেষণার জন্য নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন তিনি বলেছেন- বিবর্তনের ক্রিয়ার মাধ্যমে কোন বিশেষ বিষয়ের সিদ্ধান্তে আসতে আমরা অসমর্থ।(তথ্যসূত্র ৭)
৫. ডা. কলিন প্যার্টাসন একজন বিবর্তনবিদ এবং প্যালিয়নটোলজিস্ট ( জীবাশ্মবিদ), তিনি লন্ডন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের কিউরেটর এবং মিউজিয়ম জার্নালের সম্পাদক, বিবর্তন নিয়ে তার লেখা একাধিক বই আছে, তার বিখ্যাত বই -ইভলিউশন। ১৯৮১ সালে তিনি তার Evolution and Creationism: Can You Tell Me Anything About Evolution? বইতে লেখেন-গত বছর আমার হঠাৎ উপলব্ধি হল গত বিশ বছর ধরে আমি বিবর্তন নিয়ে কাজ করেছি,অথচ এ নিয়ে আমার কাছে একটাও প্রমাণ নেই। এটা আমাকে হতবিহ্বল করে দিল যে কী করে মানুষ এতটা দিন ভুল পথ ধরে এগিয়েছে। পরবর্তী কয়েকসপ্তাহ আমি বিভিন্ন সভায় এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে একটি সহজ প্রশ্ন করেছি, আপনারা কেউ কি একটা কিছু বলতে পারেন বিবর্তনবাদের পক্ষে শুধুমাত্র একটা উদাহরণ কি কেউ দিতে পারেন যা সত্য। যার একটা উত্তরই আমি পেয়েছি তা হল -নীরবতা। এ প্রশ্ন আমি করেছি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ইভোলিউশনারী মরফোলজি সেমিনারের মেম্বারদের কাছে-অনেকক্ষণ নীরবতার পর বিবর্তনবাদ নিয়ে উচুপর্যায়ের এক ব্যক্তি বললেন-আমি শুধু আপনাকে এটা বলতে পারি এ বিষয়টা স্কুল কলেজে পড়ানো ঠিক নয়।’(তথ্যসূত্র ৮)
তথ্যসূত্র:
1.Dr. Michael Walker, “Evolved Or Not, That’s the Question,” Quadrant, October, 1981, p. 45.
2.On the Origin of Species By Charles Darwin, October 1st, 1859.
3.N.C. Gillespie, Charles Darwin and the Problem of Creation, University of Chicago, 1979, p. 2.
4.Pierre Paul Grassé, Evolution of Living Organisms, New York: Academic Press, 1977, p. 8.
5. Derek Ager, “The Nature of the Fossil Record.” Proceedings of the Geological Association, Vol. 87, No. 2, 1976, p. 132.
6. Introduction: De (Evolution), Encyclopedie Française, Vol. 5 (1937) p. 6.
7. François Jacob, Le Jeu des Possibles [“The Play of Possibilities”], Paris: LGF, 1986.
8. Dr. Colin Patterson, “Evolution and Creationism: Can You Tell Me Anything About Evolution?”November 1981 Presentation at the American Museum of Natural History, New York City
আগের পোষ্ট: অ্যান্টি নাস্তিকতা (১): মানুষের উৎপত্তি
Entry filed under: প্রথম পাতা, যুক্তি, শিক্ষা. Tags: .
Trackback this post | Subscribe to the comments via RSS Feed